একসময় মানুষের কাছে নিছক ফেলনা বস্তু ছিল হাঁসের পালক। বাড়ির আশপাশে কিংবা ময়লার স্তূপে তা ফেলে দেওয়া হতো। তবে সেই অবহেলিত পালকই এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় এক রপ্তানি পণ্য। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর বাজারে হাঁসের পালক সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে ‘ডাউন’ বা পালকের তুলা। আর এই তুলা দিয়ে তৈরি হচ্ছে শীতের জ্যাকেট, কম্বল ও বালিশ (পিলো)। এছাড়া পালকের একটি বড় অংশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ব্যাডমিন্টনের ফেদারের কক।
তিলকপুর বাজারে গড়ে ওঠা ‘শারাবাংলা ডাউন প্রোডাক্টস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান অভিনব এই উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২২ টন হাঁসের পালক সংগ্রহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। আধুনিক মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করার পর চীন, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ানের মতো দেশে পাঠানো হচ্ছে এসব পালক। উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগ পেলে এই খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও উদ্যোক্তা মো. আলতাফ হোসেন জানান, ২০১৪-১৫ সালের দিকে তিনি ছোট পরিসরে হাঁসের পালক নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকায় তখন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি। দমে না গিয়ে ২০১৫ সালে তিনি সরাসরি চীনে যান এবং এ বিষয়ে পড়াশোনা ও এক বছরের ইন্টার্নশিপ করেন। সেখানে পালক সংগ্রহ, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
দেশে ফিরে সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ২০২২ সালে নতুন উদ্যমে ব্যবসা শুরু করেন আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, শুরুতে মানুষ বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি। পরে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে পালকের অর্থনৈতিক মূল্য সম্পর্কে সচেতন করা হয়। বর্তমানে সারাদেশে তাদের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি ভেন্ডার বা সংগ্রহকারী পয়েন্ট রয়েছে। কাজের মান বাড়াতে চীন থেকে বিশেষায়িত মেশিন আমদানি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পালক বাছাই, পরিষ্কার ও ডাউন বা তুলা তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমানে চীন, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ানে পণ্য রপ্তানি হলেও রাশিয়াতেও এর বড় চাহিদা রয়েছে।
এই উদ্যোগে শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই অর্জিত হচ্ছে না, পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসছে। আগে যেখানে হাঁসের পালক যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হতো, এখন তা সংরক্ষণ করে বাড়তি আয় করছেন খামারি ও সাধারণ মানুষ।
বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় নারী-পুরুষসহ ১৬ জন নিয়মিত কর্মী কাজ করছেন।
স্থানীয় কর্মী মিমি আক্তার বলেন, “এখানকার আয়ে আমার সংসার খুব ভালোভাবে চলছে এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচও চালাতে পারছি।”
আরেক কর্মী সোহেল রানা জানান, তাঁর বাবা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, পরবর্তীতে তিনিও বাবার পথ ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
উদ্যোক্তা আলতাফ হোসেনের মতে, এই খাতকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে পুরো প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আরও ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ পেলে দেশেই এই পালকের তুলা দিয়ে জ্যাকেট, কম্বল ও পিলো তৈরি করে সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি হাঁসের বড় পালক দিয়ে ব্যাডমিন্টনের ফেদার কক তৈরি করে ভারতে পাঠানো হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত করা যাবে।
আক্কেলপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আমিরুল ইসলাম বলেন, হাঁসের পালককে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার ফলে খামারিরা বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন, যা হাঁস পালনে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্ভাবনাময় এ ধরনের উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
তবে এবিষয়ে এখনও কোনো তথ্য জানেন না জয়পুরহাট বিসিক কর্তৃপক্ষ।
জানতে চাইলে শিল্প ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক) জয়পুরহাট জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, এটিও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতাভুক্ত। তবে আমরা এ বিষয়ে এখনও কিছু জানিনা।
মন্তব্য করুন