অনলাইন ডেস্ক
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:৪০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ইশরাক-সালাম-সোহেল: ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির প্রার্থী বাছাইয়ে কঠিন সমীকরণ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী নিয়ে বিএনপির ভেতরে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। নির্বাচন কমিশন এখনো ভোটের চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা না করলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে মাঠপর্যায়ে তৎপরতা বাড়ছে। আলোচনায় রয়েছেন ইশরাক হোসেন, আব্দুস সালাম ও হাবিব উন নবী খান সোহেল।

দলীয় সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত কাউকেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়নি। সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা, নিজস্ব ভোটারভিত্তি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেবে বিএনপি।

দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এ বিষয়ে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা হবে। তাঁর ভাষ্য, প্রার্থী নির্বাচন দলের অভ্যন্তরীণ কৌশলগত বিষয় এবং সময়মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

ইশরাক হোসেনের পক্ষে তরুণ ও স্থানীয় সমীকরণ

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ইশরাক হোসেনকে ঘিরে বিএনপির একটি অংশের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি। ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে তিনি ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫১২ ভোট পেয়েছিলেন।

পুরান ঢাকার রাজনীতিতে পারিবারিক পরিচিতিও ইশরাকের অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর বাবা প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ফলে পুরান ঢাকায় খোকা পরিবারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচিতি ইশরাকের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন দলটির অনেক নেতা।

এ ছাড়া তরুণ ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকায় সরাসরি প্রচারণার অভিজ্ঞতাও তাঁর পক্ষে যাচ্ছে বলে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের একটি অংশের দাবি।

সিটি নির্বাচনে ফের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে ইশরাক হোসেনের বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। দল প্রয়োজন মনে করলে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে নির্বাচনী মাঠে নামতেও তিনি প্রস্তুত।

ইশরাকের মতে, তাঁর রাজনৈতিক পথচলার শুরুই হয়েছিল নগরকেন্দ্রিক রাজনীতি ও নাগরিক সমস্যা সমাধানের ভাবনা থেকে। আগের সিটি নির্বাচন তাঁকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে সহায়তা করেছে বলেও তিনি মনে করেন।

প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় এগিয়ে আব্দুস সালাম

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালামও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন।

নগর পরিচালনায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে তিনি ঢাকা সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ডিএসসিসির প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় নগরীর বিভিন্ন সমস্যা, সেবা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাঁর সরাসরি অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আব্দুস সালামের অনুসারীদের তৎপরতাও এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে। ব্যানার ও পোস্টারের মাধ্যমে তাঁর সম্ভাব্য প্রার্থিতার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে।

প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। ওয়ার্ড চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর ও ডেপুটি মেয়র হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে তিনি নিজের বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তাঁর মতে, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সীমিত হওয়ায় সব কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পেলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নগরবাসীকে আরও কার্যকর সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

সাংগঠনিক শক্তিতে হাবিব উন নবী খান সোহেল

তিনজনের মধ্যে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ নাম বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলীয় সাংগঠনিক যোগাযোগ তাঁর প্রধান শক্তি।

স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। দলটির কেন্দ্রীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত তাঁর সাংগঠনিক যোগাযোগকে সম্ভাব্য প্রার্থিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন এলাকায় তাঁর সমর্থকদের ব্যানার-পোস্টারও দেখা গেছে। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় তাঁর ছবি ও শুভেচ্ছাবার্তাসংবলিত প্রচারসামগ্রী টানানো হয়েছিল।

তবে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে এখনো দলীয় কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছেন হাবিব উন নবী খান সোহেল। দল যে দায়িত্ব দেবে, সেটিই পালন করতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানিয়েছেন।

তিনজনের তিন ধরনের শক্তি

বিএনপির সম্ভাব্য এই তিন প্রার্থীর রাজনৈতিক শক্তির ধরনও আলাদা। ইশরাক হোসেনের ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিচিতি, পারিবারিক ঐতিহ্য, তরুণদের আকর্ষণ এবং আগের সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। আব্দুস সালামের ক্ষেত্রে নগর পরিচালনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বড় সম্পদ। আর হাবিব উন নবী খান সোহেলের প্রধান শক্তি দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতি এবং বিস্তৃত সাংগঠনিক যোগাযোগ।

ফলে শেষ পর্যন্ত বিএনপির হাইকমান্ড কোন বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়, তার ওপরই প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত অনেকাংশে নির্ভর করবে।

প্রতিদ্বন্দ্বীদের তৎপরতায় বাড়ছে চাপ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনকে বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন দলটির নেতারা। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে তৎপরতা শুরু করায় বিএনপির ওপরও প্রস্তুতির চাপ বাড়ছে।

দক্ষিণ সিটির পুরান ঢাকা, মধ্যাঞ্চল এবং নতুন যুক্ত হওয়া এলাকাগুলোর ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান ও স্থানীয় চাহিদায় পার্থক্য রয়েছে। তাই শুধু দলীয় প্রতীকের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।

৮ সাংগঠনিক টিমে মাঠের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ

নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতিও জোরদার করছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি। থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম তদারকিতে ইতোমধ্যে আটটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।

দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন জানিয়েছেন, দলীয় নির্দেশনা অনুযায়ী সংগঠনকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রাখতে এসব টিম মাঠে কাজ করছে। প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডের সাংগঠনিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হচ্ছে।

এদিকে দলের শৃঙ্খলা ও নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম আহ্বায়ক সাইদুর রহমান মিন্টুর ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে এমন কর্মকাণ্ডে কেউ জড়াচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

মেয়র পদের পাশাপাশি সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করছে দল। তাদের জনপ্রিয়তা, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সম্ভাব্য তিন প্রার্থীকে ঘিরে চলছে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক হিসাব। তফসিল ঘোষণার পর দলীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই জটিল সমীকরণের চূড়ান্ত সমাধান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রিয়াদে টানা তৃতীয় দিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি, বন্ধ বিমানবন্দর

১

জয়পুরহাটে ট্রাকের ধাক্কায় ক্ষেতলালের যুবক নিহত

২

ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রোটনের মরদেহ বেনাপোলে হস্তান্তর

৩

ক্ষেতলালে রাতের আঁধারে অসুস্থ গরু জবাই, ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা

৪

পাবনার বেড়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিজিশিয়ান স্যাম্পল ওষুধ বিক্রি: দুই ফার্মেসিকে জরিমানা

৫

ইউপি নির্বাচন: চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত ও সাধারণ সদস্য প্রার্থীদের জন্য প্রতীক বরাদ্দ প্রকাশ

৬

স্থানান্তর ফিচারে ফিরল ভোটাররা: ইসি’র নতুন নির্দেশনা জারি

৭

বোয়িং থেকে আরও ১১ উড়োজাহাজ কিনছে বিমান, চুক্তি স্বাক্ষর আজ

৮

মহাখালীতে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় প্রাণ গেল নারীর

৯

কেন পালিত হয় পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম?

১০

আগামীকাল ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি

১১

বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে বাড়লো ১৭ পয়সা

১২

ভারতে পাচারকালে কষ্টিপাথরের মূর্তি উদ্ধার, আটক ৪

১৩

জয়পুরহাটের হাঁসের পালক যাচ্ছে বিদেশে

১৪

জয়পুরহাটে ৫০৫ পিস ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

১৫

ধানের পাশাপাশি মাচাভরা সবুজ ফসলে বদলে যাচ্ছে ক্ষেতলালের কৃষির চিত্র

১৬

পাঁচবিবিতে মাদ্রাসার ৪’তলা ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন

১৭

সাবেক সিইসি হাবিবুল আউয়ালের জামিন মঞ্জুর,স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন

১৮

রাবি শিক্ষার্থী ও রেলকর্মীদের বিরোধ: ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

১৯

চাকরি থেকে পলায়নের অভিযোগ: ঢাকার সাবেক এসপি আসাদুজ্জামানসহ ৬ কর্মকর্তা বরখাস্ত

২০