মো. হেদায়েতুল্লাহ
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৮ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

সাইবার সুরক্ষা আইন: নাম বদল নয়, চাই নাগরিকের নিরাপত্তা

ডিজিটাল যুগে একটি দেশের সাইবার পরিসর নিরাপদ রাখা জাতীয় নিরাপত্তারই অপরিহার্য অংশ। হ্যাকিং, আর্থিক জালিয়াতি, তথ্য চুরি, ফিশিং, ম্যালওয়্যার ও সাইবার বুলিংয়ের মতো অনলাইন অপরাধ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ও যুগোপযোগী আইনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে বাংলাদেশের অতীতের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—সাইবার নিরাপত্তার নামে প্রণীত আইন যদি অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত ক্ষমতানির্ভর হয়, তবে তা নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মৌলিক ডিজিটাল অধিকারকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে।

অতএব, প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনকে কেবল পুরোনো আইনের নাম পরিবর্তন বা সামান্য রুটিন সংশোধন হিসেবে দেখলে চলবে না। বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি সম্পূর্ণ নতুন, প্রযুক্তিবান্ধব, স্পষ্ট এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডসম্মত আইনি কাঠামো।

আমাদের অতীত আইনগুলোর অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিল প্রকৃত সাইবার অপরাধ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে নাগরিকের স্বাধীন মতপ্রকাশকে একই পাল্লায় মাপা। অথচ সার্ভার হ্যাক, র‍্যানসমওয়্যার হামলা, ম্যালওয়্যার ছড়ানো কিংবা ফিশিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ স্পষ্টতই ফৌজদারি সাইবার অপরাধ। অন্যদিকে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা, ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কিংবা সমাজ বা রাষ্ট্রের যেকোনো অনিয়ম প্রকাশ করা কখনোই সাইবার অপরাধ হতে পারে না।

নতুন আইনে ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ বা অস্পষ্ট উসকানিমূলক ব্যাখ্যানির্ভর শব্দের ব্যবহারে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কারণ অপরাধের সংজ্ঞা যদি স্পষ্ট না হয়, তবে তার প্রয়োগও সহজেই নির্বিচার ও হয়রানিমূলক হয়ে পড়ে। আইনের প্রতিটি অপরাধের সংজ্ঞা হতে হবে সুনির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য এবং বিচারবিভাগীয় আদালতে পরীক্ষাযোগ্য।

একই সঙ্গে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার নতুন আইনে যথাযথভাবে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন। সাংবাদিকেরা যদি ডিজিটাল আইনে মামলার আশঙ্কায় আত্মনিয়ন্ত্রণে (Self-censorship) বাধ্য হন, তবে দুর্নীতি, অনিয়ম ও সামাজিক অসংগতি তুলে ধরার পথ সংকুচিত হয়ে পড়বে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিল বা স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশনের মতো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে।

তবে এই সুরক্ষার বলয় কেবল প্রাতিষ্ঠানিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন সাধারণ মানুষেরও মতামত প্রকাশের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। একজন সচেতন নাগরিক, শিক্ষার্থী কিংবা অধিকারকর্মীর আইনসম্মত ফেসবুক পোস্ট, ব্লগ বা অনলাইন পর্যবেক্ষণও মতপ্রকাশের স্বাধীনতারই অংশ। সাংবাদিকদের এক ধরনের ছাড় দিয়ে সাধারণ নাগরিককে ডিজিটাল হয়রানির ঝুঁকিতে রাখা হলে আইনের মৌলিক ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে স্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাস থাকা দরকার। প্রযুক্তি, নেটওয়ার্ক, তথ্য ও ডিভাইসের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ এবং অনলাইনে প্রকাশিত কনটেন্ট—এই দুই বিষয়কে এক করে দেখলে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইনের প্রয়োগের আগে ক্ষতির মাত্রা, উদ্দেশ্য ও বাস্তব প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট সীমারেখা থাকা দরকার। বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, ঢালাওভাবে ডিভাইস জব্দ কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য অনুসন্ধানের মতো ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশি ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের সময় নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বজায় রাখতে হবে।

প্রযুক্তি ও মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন আপিল বা পর্যালোচনা কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার কিংবা মতপ্রকাশসংক্রান্ত অভিযোগের প্রাথমিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলে ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক মামলার চাপ বহুলাংশে হ্রাস পাবে।

অবশ্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতা নয়। শিশু পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং, অনলাইনে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি কিংবা সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু অপরাধ দমনের অজুহাতে এমন কোনো আইন করা যাবে না, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকেই রুদ্ধ করে।

প্রস্তাবিত আইন চূড়ান্ত করার আগে সরকার, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনা প্রয়োজন। একটি কার্যকর সাইবার আইন শুধু প্রযুক্তিকেই সুরক্ষিত করবে না, একই সঙ্গে নাগরিকের অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও রক্ষা করবে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাইবার আইন নাগরিকের জন্য সুরক্ষার ঢাল হবে, কণ্ঠরোধের খড়গ নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি নিরাপদ ডিজিটাল সমাজ, যেখানে প্রযুক্তি হবে সুরক্ষিত এবং নাগরিকের স্বাধীনতা থাকবে অক্ষুণ্ন।

লেখক: সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ঢাকা।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রংপুরে অটোরিকশা চুরির অভিযোগে গণপিটুনি, নিহত ২

১

যুব উন্নয়নের প্রশ্ন ফাঁস: ৭ আসামির দুই দিনের রিমান্ড

২

বগুড়ায় ১৫ বছরের শ্যালিকাকে অপহরণের পরে ধর্ষণ, দুলাভাইয়ের যাবজ্জীবন

৩

শিক্ষার্থীর মায়ের আপত্তিকর ভিডিও ছড়ানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ, মাদ্রাসাশিক্ষক আটক

৪

নওগাঁয় বাড়িতে ঢুকে চেতনানাশক ঔষধ স্প্রে করে স্বর্ণ-চাঁদি ও নগদ টাকা চুরি

৫

চেতনানাশক দিয়ে ধর্ষণের পর জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ খাওয়াতেন মাদ্রাসাশিক্ষক

৬

সৌদিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত সাহেদের দাফন সম্পন্ন, স্ত্রী-সন্তানের আহাজারি

৭

নাটোরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত অন্তত ৩০

৮

ডেমরায় জবির ‘নোঙর’ বাসে আগুন, হতাহত নেই

৯

উখিয়ায় রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের মৃত্যু: মালিক ও ম্যানেজারের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ১

১০

সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ প্রক্রিয়াধীন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

১১

ভারত থেকে এলো ১৮টি নতুন ব্রডগেজ কোচ, পৌঁছাল সৈয়দপুরে

১২

বগুড়ায় ট্রেনের ধাক্কায় নারীর মৃত্যু, মরদেহের ওপর দিয়ে গেল আরেক ট্রেন

১৩

দুপচাঁচিয়ায় লোটো শোরুমের ম্যানেজার হত্যা: ১০ মাস পর প্রধান আসামি গ্রেপ্তার

১৪

কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যু, একই পরিবারের ৬ জন

১৫

মক্কায় মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

১৬

বগুড়ায় এনসিপির জেলা কার্যালয়ে আগুন, সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ছড়াল

১৭

চাঁদা না দেওয়ায় ফিলিং স্টেশনে আগুন দেওয়ার অভিযোগ, পুড়ল ৩ বাড়িসহ ৪ প্রতিষ্ঠান

১৮

সাইবার সুরক্ষা আইন: নাম বদল নয়, চাই নাগরিকের নিরাপত্তা

১৯

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অ্যাওয়ার্ড ও স্কলারশিপ পেলেন ক্ষেতলালের আশিক

২০